অর্থনীতির সাথে সাথে আমাদের চারিত্রিক উন্নতিও জরুরি

অর্থনীতির সাথে আমাদের চারিত্রিক উন্নতিও জরুরি
মোহাম্মদ আমান উল্লাহ আমান

ভদ্রতা ও সৌজন্য প্রদর্শনে জাপানিদের জুড়ি নেই। বিশ্বের যে কোন দেশে যে কোন পরিবেশে তারা অত্যন্ত মার্জিত। জাপান হলো এশিয়ার এক মাত্র উন্নত দেশ যে দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় চল্লিশ হাজার মার্কিন ডলারের চেয়েও বেশি। অর্থনৈতিক ভাবে এত শক্তিশালী হওয়ার পরও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর কারো সাথে শক্তির বড়াই করতে দেখা যায়নি। জাপানিরা যে কতটুকু সভ্য তা তারা গেল বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছে। খেলায় হেরেও তারা স্টেডিয়াম পরিচ্ছন্ন করার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর হৃদয় জয় করেছে। কয়েক বছর আগে হলি আর্টিজেন হামলায় বাংলাদেশে একজন জাপানি নাগরিকের মৃত্যু হয়। ঠিক কাছাকাছি সময়ে উত্তরবঙ্গে একজন জাপানি নাগরিককে হত্যা করা হয়। সবাই ধারণা করেছিল এই ঘটনা জাপান বাংলাদেশ সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। কিন্তু ফেলেনি। অতীতের মতো এখনও জাপান আমাদের ভালো বন্ধুদেশ। জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকা বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা।

জাপানিদের নিয়ে এত কিছু বললাম এই কথা বুঝানোর জন্যই যে, জাপানিরা শুধু অর্থনৈতিক ভাবেই সমৃদ্ধি লাভ করেনি, মানবিকতার দিক থেকেও তারা উন্নতি লাভ করেছে। তারা দুর্নীতি করে না, দেশের অর্থ পাচার করে না। তারা বুঝে কাজ; তারা বুঝে মানবতা। ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রেও একই রকম দেখা যায়। তারা অর্থনৈতিক এবং মানবিক উভয় দিক দিয়েই উন্নত। ঐক্য ও উদারতায় তারা অনন্য। তাদের সহনশীলতা দেখলে মনেই হয় না যে এক সময় তারা ভয়ানক গৃহযুদ্ধে লিপ্ত ছিলো। জাপানিরাও কিন্তু যুদ্ধবাজ জাতি ছিলো আজকের দিনে যা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে।

বিশ্বায়নের প্রভাব এবং দক্ষ নেতৃত্বের গুণে বাংলাদেশের মানুষেরও আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। পাকিস্তানি আমলের বাইশ পরিবার এখন বাইশ শত পরিবারে রূপান্তরিত হয়েছে। দেশের অর্থনীতির আকার বেড়েছে। রাষ্ট্রীয় বাজেটের আয়তনও বেড়েছে বহুগুণ। মাথা পিছু আয় বেড়েছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ব্যয়ও। এক সময় এদেশের মানুষের অভাব ছিল। নিত্য পণ্যের দাম কম থাকলেও কেনার সামর্থ্য ছিল না। অভাবের তাড়নায় গৃহকর্তা অথবা গৃহকর্ত্রীর আত্মহত্যার সংবাদ কতবার যে শিরোনাম হয়েছে বাংলাদেশে, তার কোন হিসেব নেই। আজ আমাদের সেই দিন আর নেই। আমাদের জনসংখ্যা যখন সাড়ে সাত কোটি ছিল, তখন না খেতে পেয়ে এদশে মানুষের মৃত্যু হতো। অথচ এখন জনসংখ্যা প্রায় তিনগুণ। তারপরও খেতে না পেয়ে জীবনের কাছে হেরে যাওয়ার গল্প এখন আর শোনা যায় না। নিঃসন্দেহে আমাদের উন্নতি হয়েছে। কিন্তু আমাদের সক্ষমতার তুলনায় এই উন্নতি কতটুকু?

আমার এই প্রশ্নের সদুত্তর কেউ দিতে পারবেন বলে মনে হয় না। আমাদের চার ভাগের এক ভাগ জনশক্তি নিয়ে যদি ইউরোপের দেশগুলো উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, তাহলে আমাদের কী হওয়া উচিত? যা হওয়া উচিত তা কী আমরা হতে পেরেছি? যদি না পেরে থাকি, তবে কেন পারিনি? এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? কতিপয় চতুর লোকের কাছে এই প্রশ্নের একটি সহজ উত্তর আছে। তারা বলবেন, এই দেশের বয়স মাত্র পঞ্চাশ বছর। উন্নত দেশগুলো তো আর এমন পঞ্চাশ বছরেই উন্নত হয়ে যায়নি। তারা নিশ্চয় এমন পঞ্চাশ বছরেই সুশীল হয়ে যায়নি। তাহলে আমাদের এতো তাড়া কেন? আমাদের সময়তো আর শেষ হয়ে যায়নি। তারা হয়তো আমাদের বর্তমান মোটা দাগের প্রবৃদ্ধির উর্ধ্বমুখী হার নিয়েই সন্তুষ্ট। তারা বুঝতে চান না যে আমাদের এই সমাজটি পঞ্চাশ বছরের নয়; কয়েক হাজার বছরের। কয়েক হাজার বছরেও যারা তাদের নৈতিকতার ভিত শক্ত করতে পারেনি, তারা আর কবে পারবে?

আজ আমরা পত্রিকার পাতায় বেগম পাড়ার মুখরোচক গল্প পড়ি। জি.কে. শামীম গংদের সম্পদের হিসাব কষতে এক্সেল ফাইল খুলে বসি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিংবা রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের লাগামহীন দুর্নীতির ভাইরাল হওয়া খবর দেখে পিলে চমকে যাই। সরকারি কর্মকর্তাদের পুকুর কাটা, খিচুড়ি রান্না, ঘাস কাঁটা এবং শুঁটকি বানানো বিষয়ে বিষদ জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে সরকারি অর্থ ব্যয় করে দল বেঁধে বিদেশ ভ্রমণের শিরোনাম দেখে চোখ মুখে আগুন ঝারি। কিন্তু নিজের দিকে তাকাই না কেউ।

নিজের সন্তানকে ছোট মাছ খেতে দিয়ে সতীনের সন্তানের জন্য বড় মাছটি তোলে রাখার মানসিকতা আমাদের মায়েদের নেই। মাঠে খেলতে গিয়ে সন্তান পাড়ার ছেলের সাথে ধাক্কা খেয়ে ব্যথা পেয়ে আসলে আমাদের বাবারা গিয়ে অভিভাবকের নিকট নালিশ জানিয়ে আসেন। কিন্তু নিজের সন্তানকে সরি বলতে শেখান না। এই ছোট ছোট জায়গায় যারা বড় হতে পারে না, তারা কীভাবে বৃহৎ স্বার্থ ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত হবে। আর তাদের সন্তানরাই বা তাদের কাছ থেকে কী শিখবে?

এই যদি হয় আমাদের অবস্থা তাহলে সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুটি আমাদের কাছ থেকে কী শিখবে? আর বড় হয়ে এই শিশুটি কী হতে চায়বে? শিশুর চাওয়া মতো তাকে বেড়ে উঠতে দিতে আমরা কতোটা প্রস্তুত? কথায় আছে–যে পশু আবর্জনা খায়, সে পশুর বাচ্চা শুঁকে হলেও যায়।

আপনারা যারা নাগরিকদের আচার-আচরণ, মানবিকতা ও চরিত্রের উন্নতি না করেই দেশের অর্থনীতির উন্নতি করে আত্মতৃপ্তিতে ভুগছেন, তারা উন্নয়ন অর্থনীতির কোন ফর্মুলা ব্যবহার করছেন আমার বুঝে আসে না। উন্নয়ন অর্থনীতির গুরু ড. অমর্ত্য সেন দারিদ্র্যের সংজ্ঞায় বলেছেন নিজের সক্ষমতা বুঝতে না পারাই হল দারিদ্র্য। আমার দেশের মানুষ কি তাদের সক্ষমতা বুঝে? বুঝলে নিশ্চয় সৎ উপার্জন বাদ দিয়ে অসৎ উপার্জনে লিপ্ত হতো না। নিজের মেধা আর বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে নিজের, পরিবারের, সমাজের, দেশবাসীর তথা বিশ্ববাসীর কল্যাণে নিবেদিত থাকতো। আমাদের মানবিকতা দেখে বিশ্ববাসী সম্মাান করতো।

যারা দেশের উন্নয়ন নিয়ে ভাবেন, আশা করি তারা দেশের অর্থনীতির উন্নতির পাশাপাশি দেশের মানুষের আচার-আচরণ ও চারিত্রিক উন্নতি নিয়েও ভাববেন।