কেন গবেষণা কাজে সহযোগিতা করা আপনার কর্তব্য

অর্থনীতির সাথে আমাদের চারিত্রিক উন্নতিও জরুরি
মোহাম্মদ আমান উল্লাহ আমান

আমি একজন তরুণ শিক্ষানবিশ গবেষক। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন কালে দুজন গবেষক শিক্ষকের কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে তাঁদেরই দেখানো পথে আমার গবেষণার হাতেখড়ি হয়। গবেষক হওয়ার স্বপ্নটি আমার সেখান থেকেই তৈরি হয়েছিল। একাডেমিক পাঠ শেষে বিপণন কর্মকে পেশা হিসেবে বেছে নিলেও গবেষণা থেকে নিজেকে কখনো বিচ্ছিন্ন রাখতে পারিনি। কর্ম জীবনে এসে দেশের খ্যাতনামা কয়েকজন গবেষকের সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য হয়েছে। তাদের কাছ থেকে দীক্ষা নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। একক ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কয়েকটি গবেষণা কর্ম পত্রাকারে সম্পন্ন করেছি। এর মধ্যে অল্প কয়েকটি আবার আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই নিজের এই অর্জন দেখে, নিজের মধ্যে একটি ভালো লাগা তৈরি হওয়ার কথা। সেই সাথে গবেষণা ক্ষেত্রটি নিয়ে নিজের মধ্যে একটি আশাও জাগ্রত হওয়ার কথা। কিন্তু অতীব দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে যে, আমার মধ্যে দুটির একটিও তৈরি হয়নি। আর কেন তৈরি হয়নি সে বিষয়টি বলা আবশ্যক বলে মনে করছি। কেননা এর সাথে আমাদের জাতীয় স্বার্থ জড়িত।

একজন গবেষণা শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করার সুবাদে এ জাতির একটি নতুন পরিচয় আমার কাছে উন্মোচিত হয়েছে। এ জাতি জ্ঞান একটি বিমুখ জাতি। জ্ঞান অন্বেষণে রয়েছে আমাদের প্রচণ্ড অনীহা। জ্ঞানের গুরুত্ব বুঝতে আমরা অক্ষম। জ্ঞানীদের মূল্যায়ন করতে অপারগ। জ্ঞান অন্বেষণকারীদের সহযোগিতা করতে অপ্রস্তুত। ব্যক্তিগত জীবনেও জ্ঞানের সঠিক প্রয়োগে ব্যর্থ। আর এই কারণেই এদেশে দায় সারা গবেষণা হয়, কিন্তু জ্ঞানের নতুন নতুন মাত্রা নিয়ে কাজ হয় না। অথচ প্রতিটি গবেষণা কমের্র মাধ্যমে জ্ঞানের নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার কথা। একেকটি গবেষণা কর্ম নতুন নতুন সমস্যার সমাধানে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখার কথা। অথচ দেশে বিদ্যমান সমস্যা ও গবেষকের সংখ্যা এবং তার বিপরীতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় অগ্রগতির চিত্র দেখলে এদেশে গবেষণার কার্যকারিতা বুঝা যায়। এমনিতেই গবেষণা কর্মের সংখ্যা কম। তারপর আবার অফলপ্রসু। অর্থাৎ একজন গবেষক অনেক কষ্ট করে একটি গবেষণা করলেন অথচ তা আমাদের দেশের কোন কাজে আসলো না। গত কিছু দিন ধরেই এই বিষয়টি আমাকে ভাবাচ্ছে। ভাবতে ভাবতে শেষে মনে হলো এ বিষয়ে একটি নসিহত নামা লিখা জরুরী। তাই আজকের এই নিবন্ধ।
একটি গবেষণা কর্ম সঠিকভাবে এবং সময় মতো সম্পন্ন করতে হলে প্রয়োজন হয় সঠিক উপাত্তের (ডেটা)। আর উপাত্ত সংগ্রহ করতে হয় গবেষণা কর্মের ধরণ অনুযায়ী ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছ থেকে। এই ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছ থেকে উপাত্ত সংগ্রহ করা ব্যয় ও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। আমার কাছে মনে হয়, আমাদের গবেষকগণ অর্থের অভাবে পর্যাপ্ত উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারেন না। আর যা সংগ্রহ করেন তার সত্যতা নিয়েও আমার মনে প্রশ্ন থেকে যায়।

আমাদের দেশে গবেষণা কার্য পরিচালনা করেন মূলত আমাদের বিশ্ববিদ্যায়গুলোর দরিদ্র অধ্যাপকগণ আর তাদের উত্তরসূরী কিছু শিক্ষানবিশ। নিয়মিত গবেষণার জন্য তারা সরকার থেকে অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কোন তহবিল পান না। গবেষণার সম্পূর্ণ খরচ নিজেদেরই বহন করতে হয়। সম্মানী যা পান তা থেকে সংসারের খরচ মিটিয়ে আর যা ই হোক গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত টাকা নিশ্চয় জমাতে পারেন না। যেহেতু পদোন্নতির জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রকাশনা থাকা আবশ্যক, সেহেতু বাধ্য হয়ে কিছু একটা তাদের করতেই হয়। এ জন্যই আমি এই গবেষণাগুলোকে দায়সারা গবেষণা বলি। যদিও আমাদের সম্মানিত অধ্যাপকগণ সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েই তাদের গবেষণা কর্ম পরিচালনা করেন তাদের বিবেকের তাগিদে। তাতেও কি তাদের পরিশ্রম ও অর্থ ত্যাগ সার্থক হয়? আমার কাছে মনে হয় না। কেন হয় না সে সংক্রান্ত আমার কয়েকটি অভিজ্ঞতা আজকে আপনাদের সাথে শেয়ার করবো।

কয়েক বছর আগে আমার কয়েকজন সহযোগী একটি গবেষণা কাজের জন্য উপাত্ত সংগ্রহের কাজ করছিল। প্রথমে তারা রেসপনডেন্টের সাথে সরাসরি সাক্ষাত করে উপাত্ত সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিল। উপাত্ত সংগ্রাহকরা যাদের কাছে গেল, তাদের অধিকাংশই সময়ের অজুহাতে উপাত্ত দিতে অস্বীকৃতি জানায়। সর্বোচ্চ দশ শাতাংশ মানুষ তাদেরকে তথ্য দিল। যারা তথ্য দিল তাদের অনেকে আবার অর্ধেক তথ্য দিল। আয়-ব্যয় সংক্রান্ত তথ্য আমাদের দেশের মানুষ দিতে চায় না। শেষে না আবার আয়কর সংক্রান্ত ঝামেলায় পড়তে হয়। ফিরে এসে তারা তাদের হতাশার কথা আমার নিকট ব্যক্ত করলে আমি সান্তনা দিই। শেষে সেম্পল সাইজ কমিয়ে এনে আমরা আমাদের কাজটি সম্পন্ন করি।

এ ধরনের অভিজ্ঞতা আমার আরো আছে। কিছু দিন আগে আমার মামা (যিনি একজন অধ্যাপক) আমাকে একটি গুগল ফরম পাঠিয়ে কিছু উপাত্ত সংগ্রহ করে দিতে বললেন। আমি আমার অত্যন্ত কাছের ৫০/৫২ জনের কাছে সহযোগিতা চেয়ে পাঠিয়েছিলাম। তারপর ১০/১২ টা গ্রুপে পোস্ট করেছিলাম। পরে মামার কাছ থেকে জানতে পেরেছিলাম যে তিনি পরবর্তী দুই দিনে ১৫টা ফরম ফেরত পেয়েছিলেন।

করোনা কালে আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। আমার দুজন সহকর্মী বিভিন্ন পেশাজীবীর উপর করোনার প্রভাব ও সংকট উত্তরণে করণীয় নিয়ে গবেষণা করছেন। তাদের প্রশ্নমালাটি গুগল ফরমে করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন পেশাজীবীর গ্রুপে পোষ্ট করে দেওয়া হয়। সবার কাছে ফরমটি পূরণ করার জন্য সবিনয় অনুরোধ করা হয়। আমি নিজেও বেশ কয়েকজনের কাছে পাঠিয়েছি। দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, তার এত চেষ্টা করেও ২০ টির বেশি ফরম (প্রশ্নমালা) সংগ্রহ করতে পারে নি। তবে মজার ব্যাপার হলো – এই তরুণ গবেষকরা পরবর্তীতে একটি বিদেশি গ্রুপে পোস্ট করে ১৫০ টি ফরম (প্রশ্নমালা) সংগ্রহ করতে পেরেছিল।

আমার ধারণা, সামাজিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের অভিজ্ঞতা আমার মতোই। যদি গবেষণার অবস্থা এমনই হয়, মানুষ যদি ঠিক ঠাক তথ্য না দেয়, তাতে কি যায় আসে? গবেষণাপত্র তৈরি হওয়া তো আর বাকি থাকে না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাময়িকীতেও তো পত্র প্রকাশিত হয়। তাহলে আর সমস্যা কোথায়? আমি বলি, তাতে সমস্যা যা তৈরি হয় তা হলো নিজের পায়ে নিজে কুঠারাঘাত করা।

আমরা জানি যে, কোন একটি গবেষণা কর্ম পরিচালনার লক্ষ্য মূলত কোন একটি সমস্যার স্বরূপ উন্মোচন করা ও তা সমাধানে একটি সুপারিশমালা পেশ করা। ধরুন, যাদের সমস্যা তারা তাদের সমস্যা সংক্রান্ত কোন তথ্য উপাত্ত দিয়ে গবেষককে সহযোগিতা করল না। তাতে সামাজিক যে সমস্যাটি নিয়ে গবেষক কাজ করছিলেন, তা সঠিকভাবে উঠে আসবে না। যদি কেউ আংশিক বা ভুল তথ্য দেয়, তাহলে ভুল ফলাফল আসবে। এর উপর ভিত্তি করে সরকার যদি কোন সিদ্ধান্ত নেয়, তাতে জনগণের সমস্যা বাড়বে বৈকি, কমবে না।

আমাদের দেশে বছর বছর অনেক ধরণের শুমারি হয়। যারা তথ্য সংগ্রাহক, তাদের অনেকেই সঠিকভাবে তথ্য সংগ্রহের কাজটি করেন না। তাতেও একই সমস্যা। গবেষণায় সঠিক ফলাফল পাওয়া যায় না। আর বিশ্লেষিত ফলাফলের উপর ভিত্তি করে নেয়া সিদ্ধান্তও ভুল হয়। আর তাতে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র, সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আশা করি আমার নিবন্ধটুকুর উদ্দেশ্য পাঠক বুঝতে পারবেন। গবেষণার গুরুত্বও উপলব্ধি করতে পারবেন। এবং গবেষণায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন। নিজের, সমাজের ও রাষ্ট্রের কল্যাণে এগিয়ে আসবেন।

লেখকঃ শিক্ষানবিশ গবেষক ও বিপণন পেশাদার