তারুণ্য ও মফস্বল সাংবাদিকরা

এনাম আহমেদ
রাজধানীর সংবাদকর্মীদের চেয়ে মফস্বলের মূলধারার পেশাদার সংবাদকর্মীদের জীবন-যাপন অনেক সংকটময়। চিরকাল মফস্বল সাংবাদিকরা অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার। অথচ হলফ করে বলা যেতে পারে, প্রতিটি জেলায়ই যে সব সংবাদকর্মী মূলধারা লালন করে সাংবাদিকতা করছেন, তারা ঢাকাই সংবাদকর্মীদের চেয়ে কোনো অংশে কম যাবেন না। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক বা অনলাইন মিডিয়া যেকোন প্রতিষ্ঠানের মূল অফিসে কাজ করার যোগ্যতা রাখেন মফস্বলের মূলধারার সাংবাদিকরা। এরপরেও মফস্বলের এই সাংবাদিকদের অধিকাংশকেই অভাব সঙ্গী করে চলতে হয়। চাহিদানুযায়ী দিনরাত একত্র করে কাজ করলেও এই সাংবাদিকগুলোকে অফিস থেকে সম্মানী বা বেতন দেওয়া হয় কদাচিৎ। অথচ যেকোনো মিডিয়ার ৮০ ভাগ সংবাদের ঘাটতিপূরণ করে এই মফস্বল।

ঢাকার এক একজন সংবাদকর্মীকে নির্দিষ্ট বিট নিয়ে কাজ করতে হয় আর মফস্বলের কোনো বিট নেই। মফস্বলের সাংবাদিককে ডে ইভেন্টসহ কৃষি জমি থেকে শুরু করে রাজনীতি, দুর্নীতি, অপরাধ, খেলার খবরসহ সবগুলো ক্ষেত্রেই দৌড়াতে হয়। তাহলে ঢাকায় কর্মরত সাংবাদিক এবং মফস্বলের সাংবাদিকদের মাঝে এত ফারাক কেন?

এখানে জোর দিয়েই উল্লেখ করা যেতে পারে যে, কাজ করতে গিয়ে ঢাকার সাংবাদিকদের চেয়ে মফস্বল সাংবাদিকদের ঝুকিও বেশি। কারণ, মফস্বল সাংবাদিকরা তাদের এলাকায় মুখ চেনা। কারও বিরুদ্ধে বা অপরাধ বিষয়ক কোনো রিপোর্ট করলে ক্ষোভ প্রকাশের জন্য ওই সাংবাদিককে খুঁজে বের করা মফস্বল এলাকায় মামুলি ব্যাপার। ইতোপূর্বে যে সাংবাদিক হত্যা বা নির্যাতনের ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলোর অধিকাংশই মফস্বল এলাকার, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এরপরেও মফস্বলের সাংবাদিকরা অবহেলিত।

আবার ঢাকার সাংবাদিক নেতারাও মফস্বলের সাংবাদিকদের ব্যবহার করেন তাদের ইচ্ছেমতো। মফস্বলের সাংবাদিকরা ব্যবহৃত হনও। অথচ ওই নেতাদেরই কেউ কেউ মালিক পক্ষের হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। মুখে সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের কথা বলে বেশির ভাগ সংগঠনের নেতারা রাতারাতি মোটাতাজা হয়েছেন। নিজের আখের গোছানোর কাজ করেছেন। এমন উদাহরণ দৃশ্যমান। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, উদ্ভূত কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে কেন্দ্র নেতারা কর্মসূচি দিয়ে তা পালনের আদেশ দেন মফস্বলকে। মফস্বলের সাংবাদিকরা তখন রাস্তায় নেমে যান। সেই কর্মসূচির ফল গোপনে ভোগ করেন ঢাকার নেতারা। ঢাকার বেশির ভাগ নেতাকে কখনোই মফস্বলের সাংবাদিকদের জন্য রাস্তায় দাঁড়াতে দেখা যায় না। তাদের কখনো বলতে শোনা যায়নি, মফস্বলের সাংবাদিকদের ওয়েজ বোর্ড না দিলে তারাও ওয়েজ বোর্ড নেবেন না। সব মিলিয়ে মফস্বলের সাংবাদিকদের দুশ্চিন্তা লালন করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। এরপরও মফস্বলের পেশাদার সাংবাদিকরা পেশাকেই আঁকড়ে ধরে রাখবে। মূল সমস্যা হয়েছে বর্তমানে এই পেশায় অনেকেই আসছেন। যারা একেবারেই নতুন। নতুনরা সাংবাদিক হয়ে আত্মপ্রকাশ করার জন্য বিনা বেতন বা সম্মানীতে কাজ করতে আগ্রহী থাকেন। যার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই পেশাদার মূলধারার সাংবাদিকরা অল্প টাকাতেই বা দীর্ঘদিন বেতন বকেয়া থাকলেও ভালো কোনো প্রতিষ্ঠান না পাওয়া পর্যন্ত ছাড়তে চান না। কিন্তু বেতন বা সম্মানী দেবে এরকম ভালোর অপেক্ষার যে শেষ নেই।

আমরা যদি আজ থেকে ২০/২৫ বছর আগের সাংবাদিকতা জগতের দিকে তাকাই তাহলে কী দেখবো? মফস্বল সাংবাদিকরা কাগজে কলমে সংবাদ লিখে সেটা অফিসে পাঠাতেন ফ্যাক্সের মাধ্যমে। সে সময় ইমেইলের ব্যবহার খুব কম সাংবাদিকই করতেন। শুধু নিউজ এজেন্সিগুলো বাদ। ডেইলি পত্রিকাটাই শুধু ছিল সে সময়। সাংবাদিকরা সারাদিন নিউজের তথ্য সংগ্রহ করে রিল্যাক্সে বিকেল বা সন্ধ্যার মধ্যে ডে ইভেন্ট বা স্পেশাল স্টোরি পাঠাতেন। কিন্তু তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে এক যুগের বেশি সময় হলো সংবাদ মাধ্যমগুলোও হয়েছে আধুনিক। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পাশাপাশি অনলাইন মিডিয়ার আবির্ভাব ঘটেছে। অনলাইন মিডিয়া মানে ২৪ ঘণ্টার সংবাদ। যখনকার খবর তখনই। তাহলে এই সময়ে এসে একজন সাংবাদিককে কী পরিমাণ চাপের মাঝে কাজ করতে হয় মালিকপক্ষের এই বিষয়টি ভাবা উচিত। এরপরও কোনো নিউজ যদি দেরিতে দেওয়া হয়, অফিস থেকে মোবাইলে কল চলে আসে। নিউজ কেন দেওয়া হয়নি বা কেন দেরি হচ্ছে, এর কৈফিয়ত দিতে হয়। মফস্বলের সাংবাদিকরা কৈফিয়ত দেন। কথা শোনে।

আমরা জানি, সাংবাদিকরা সব সময়ই মাঠে থেকে কাজ করেন। গত বছর করোনার শুরু থেকেই সাংবাদিকরা মাঠে ছিলেন। করোনা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহে মফস্বলের সাংবাদিকদের ওপর চাপ ছিল অনেক বেশি। ওই সময় থেকে এখন পর্যন্ত জনগণ জানতে চায়, নিজ নিজ এলাকায় কত জন আক্রান্ত হলো, আক্রান্ত রোগীর নামসহ বিস্তারিত, কত জন মারা গেলো। সুস্থ হলো কত জন। এছাড়া মহামারি সম্পর্কিত আরও তথ্য জনগণ জানতে ও দেখতে আগ্রহী। যে কারণে চাইলেও কোনো সাংবাদিককে সুযোগ নেই ঘরে থাকার। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা এই সাংবাদিকদের কারও মাসের শুরুতেই বেতনের টাকা পকেটের তলানিতে পড়ে থাকে। কারও পকেটে টাকাই ঢোকে না। সরকারি অনুদানের ক্ষেত্রে গত বছর এক পক্ষ সাংবাদিকরা হয়েছেন প্রহসনের শিকার। অথচ সাংবাদিক কল্যাণ তহবিলের বরাদ্দের টাকা কোন একদলের সাংবাদিকদের পাওয়ার কথা ছিল না। শুধু সরকারপন্থী সাংবাদিক ইউনিয়নের সাংবাদিকরাই বরাদ্দের টাকা পেয়েছেন। চলতি বছরেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০ কোটি টাকা সাংবাদিক কল্যাণ তহবিলের অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন। এবার কী হয়, সেটাই দেখার পালা। কারণ ইউনিয়নের বাইরেও অনেক সাংবাদিক আছেন।

এছাড়া মফস্বলের পেশাদার সাংবাদিকদের আরেকটি দুঃখ এবং গ্লানি হলো, ইদানিং সাংবাদিক পরিচয়ের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। কিছু আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা, ভূঁইফোড় অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও অনলাইন টিভি’র কর্তৃপক্ষ টাকার বিনিময়ে যাকে তাকে সাংবাদিকের পরিচয়পত্র দিচ্ছে। যারা এসব মিডিয়ার কার্ড গলায় ঝুলিয়ে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছেন, তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংবাদের ‘দন্ত স’ও লিখতে জানেন না। এছাড়া তারা মূলত তাদের পরিচয়ের আড়ালে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েই এই পেশায় আসছেন। বিভিন্ন জায়গায় মাদকসহ সাংবাদিক আটক-গ্রেপ্তারের ঘটনা কারও অজানা নয়। সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র থাকলেই প্রশাসনের সঙ্গে সহজে সখ্য গড়া যায়। যে কারণে ইদানিং অপরাধী বা একাধিক মামলার আসামিও এই পেশা আসছেন। পরবর্তী সময়ে এই ব্যক্তিরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে চাঁদাবাজিসহ অনেক ধরনের অপরাধমূলক ঘটনা ঘটাচ্ছেন। দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি সরকারি কর্মকর্তাদের হয়ে তোষামোদি করছেন। যতদুর জানি আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা এবং ভুঁইফোঁড় এসব অনলাইন মিডিয়া কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকের পরিচয়পত্র একদফা পয়সা নিয়ে থাকে। মাসোয়ারাও ঠিক করে দেন তাদের। মাসোয়ারা না দিলে তাদের পূর্ব নোটিশ ছাড়াই বাদ দিয়ে নিজ পত্রিকায় সংবাদদাতা নিয়োগের বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকেন। এছাড়া পত্রিকায় ইচ্ছেমতো নিউজ ধরানোর আশায় পত্রিকার প্রধান কর্তাব্যক্তিকে প্রতিনিধিরা বিভিন্ন ধরনের উপহারও দিয়ে থাকেন। এখানে দুটো ঘটনা উল্লেখ করতে চাই।

(১) গত ৪-৫ বছর আগে হবে। আমি গ্রামের বাড়ি থেকে ফিরছি। গ্রাম থেকে ফেরার পথে বাসস্ট্যান্ডে আসতে অটোভ্যানের রিকশায় চড়তে হয়। যথারীতি অটোভ্যানে চেপেছি। অটোভ্যান চলছে। চালকের সঙ্গে কথা বলছিলাম। কথা বলতে-শুনতে-শুনতে এক সময় চমকে উঠলাম। চালক জানালেন তিনি সাংবাদিক। বগুড়ার একটি পত্রিকার তিনি উপজেলা প্রতিনিধি। চমকে উঠলেও তাকে বুঝতে না দিয়ে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলা চালিয়ে গেলাম। পরে বাসস্ট্যান্ডে এসে নামার পর সেখানকার আমার সাবেক এক সহকর্মীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তাকে ভ্যান চালককে দেখিয়ে বললাম, উনি সাংবাদিক। তিনি হাসলেন। এরপর বললেন, ‘পত্রিকার সম্পাদককে টাকা দিয়ে সাংবাদিকের কার্ড নিয়েছেন। শুধু টাকা না সম্প্রতি উনার সম্পাদককে কাঠের আলমারি আর শোকেস কিনে দিয়েছেন।’ এরপর তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসে উঠে বসি।

(২) কয়েক বছর আগে বিশেষ একটি কাজে ঢাকা-বগুড়া দৌড় ঝাপ করতে হচ্ছিল। ওই সময় আমার এক সহকর্মী বললেন, এবার ঢাকায় গেলে এই ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করবেন। তিনি ভালো একটি টেলিভিশন চ্যানেলে আছেন। আমি কথা বলেছি। আপনারও ভালো কোথাও কিছু হতে পারে। তারপর আমার সহকর্মীর কাছে থেকে নম্বরটা নিয়ে যথারীতি ঢাকায় গিয়ে ওই ব্যক্তিকে ফোন দেই। তিনি ফোন রিসিভ করার পর পরিচয় পেয়ে বললেন মগবাজারে আসুন। এরপর খোঁজাখুঁজি করে মগবাজারে তার অফিস খুঁজে পেলাম। অফিসে গিয়ে বসার অল্প কিছুক্ষণ পর তিনি আসলেন। বললেন, তিনি আর কোনো টেলিভিশন চ্যানেলে নেই। একটি পত্রিকা এগিয়ে দিয়ে বললেন, এই পত্রিকায় আছেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কোথায় কাজ করছি। আমারটা বলার পর তিনি বলতে শুরু করলেন, যদি তার পত্রিকায় কাজ করি, তাহলে আমাকে কী কী করতে হবে। এরপর প্রতিটি পেজ এক এক করে দেখালেন। প্রথমেই বললেন, আপনাকে কোনো সম্মানী বা বেতন দেওয়া হবে না। মাসে সরকারি/বেসরকারি বিজ্ঞাপন এত পরিমাণ আপনাকে দিতে হবে। সেখান থেকে আপনি কমিশন পাবেন। এরপর পত্রিকায় প্রকাশিত নিউজ দেখিয়ে বললেন, এসব নেতা বা সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে বড় বড় নিউজ করবেন। সেখান থেকেই দেখবেন আপনার মাসে অনেক ইনকাম চলে আসবে। যদি কেউ আপনার ইনকামে সহযোগিতা না করে, তাহলে তার দোষত্রুটি খুঁজে নিউজ করে দেবেন। তার কথা শুনে আমি ঘেমে যাচ্ছিলাম। কথা শেষ হলে ‘আমি একটি গুনমান সম্পন্ন পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি’। নতুন কোনো পত্রিকায় কাজ করার ইচ্ছে নেই। কথাটা সাফ জানিয়ে উঠে আসি। তবে পত্রিকাটির চাকরি আমি না নিলেও দিব্বি ওই পত্রিকার বগুড়া জেলা প্রতিনিধি মোটরসাইকেলে সাংবাদিক স্টিকার লাগিয়ে অফিসের কর্তাব্যক্তিদের উপদেশ ফলো করে কাজ করে যাচ্ছেন।