‘খবরদার এক পয়সা হারাম নিয়ে কখনো ঘরে আসবে না’

মাহবুব কবির মিলন

মাহবুব কবির মিলন

ছোট বেলায় বাসার বাজার করার প্রতি প্রচুর আগ্রহ ছিল আমার। এমনকি আমার সাড়ে তিন বছরের একমাত্র ভাইটি বাজার করার বয়স অর্জন করার পরেও সে যেন এই গুরু দায়িত্ব না পায় তার জন্য সকল চেষ্টা অব্যাহত ছিল আমার। বড় ভাই থাকতে ছোট ভাই বাজার করার মত কঠিন কাজ কেন করবে!! বাবা মা খুবই খুশি ছিলেন আমার উপর, এই বোধের জন্য।

ঈদের আগে সে দায়িত্ব আরো বেড়ে যেত, সাথে ফ্রিকুয়েন্সি। হ্যা! ছোটবেলা থেকেই অতি ভাল ছেলে ছিলাম আমি। বাজার শেষে প্রাপ্য কমিশন কেটে রেখে অবশিষ্ট অংশটুকু ফেরত দিতাম। বাবা মা কোন দিন একবারও জিজ্ঞাস করেননি বা সন্দেহ পোষণ করেননি তাতে। এত ভাল ছেলেকে সন্দেহ করা, কোন ভাল বাবা মায়ের জন্য কাঙ্ক্ষিত নয়।

দুই টাকা কমিশন মানে বিশাল কিছু ছিল সে যুগে। চার আনা দিয়ে দুটি বড় পরাটা এবং এক বাটি ভাজি পাওয়া যেত। এক টাকায় ৮টি ডিম কিনেছি অনেকদিন। যা বলছিলাম, ঈদের আগের কমিশনটা হত বেশ ভালো রকমের। সিনেমা মাস্ট, ঘুড়ি লাটাই, মার্বেল, খাওয়া দাওয়া অনেক কিছু। সে সময় স্কুল এবং স্যারের কাছে টিউশন ফাঁকি দিয়ে প্রতি সপ্তাহে মর্নিং শো দেখতাম। তার আগে বলে নেই, সিনেমা বা মর্নিং শোতে কিন্তু ইংলিশ সিনেমা দেখানো হত এবং তা ছিল খুব ভাল ভাল মুভি। কাউবয়, গ্রীক কাহিনী নিয়ে অসংখ্য সিনেমা দেখেছি আমরা।

সিনেমা দেখার এত নেশা ছিল যে, একবার শবে-বরাতের বন্ধের দিন চট্টগ্রামের আলমাস সিনেমা হলে গিয়ে দেখি হল বন্ধ। মনে খুব কষ্ট নিয়ে ফিরে এলাম বাসায়। মা জিজ্ঞাস করলেন, কিরে স্যার পড়ায়নি? কেননা যাবার সময় বলে গিয়েছিলাম, আজ বন্ধেও স্যার পড়াবে।

ছেলের প্রচন্ড পড়ার আগ্রহ দেখে বাবা সাইকেল কিনে দিলেন। আগ্রাবাদ কলোনীর পাশে জাম্বুরী মাঠে আমার দুই বিশ্বস্থ বন্ধ মনা আর ইমরুল দুই পাশে সাইকেল ধরে থাকত, আমি চালানো শিখতে লাগলাম। বিময়ে ওরা কিছু সময় সাইকেল চালানোর সুযোগ পেত। দ্রুত শিখে নিলাম সাইকেল চালানো। কারণ হলে যাবার ফ্রিকুয়েন্সি আর গতিও তো বাড়াতে হবে।

শেখার পর তথাকথিত পড়ার নামে সিনেমা হল দর্শন বেড়ে গেলে অনেকগুনে। বাজারের কমিশনও পাল্লা দিয়ে বেড়ে যেতে লাগল। আমার পড়তে যাওয়াও ডাবল হল। এক আসল পড়া, দুই সিনেমা হল পড়া। প্রচণ্ড রোদে সাইকেল চালিয়ে সিনেমা হল থেকে ফিরে বাসায় এসে এমন ভান করতাম যে, আমি শেষ!! আজ খুব পড়ার চাপ ছিল। মা কপালের ঘাম মুছে দিতেন, সাথে লেবুর শরবত।

একদিন, হ্যা সেই একদিনটা কবে কখন সেটা আর মনে নেই। মা পরম যত্নে মাথা বুলিয়ে দিয়ে ঘাম মুছে দিচ্ছেন, এক হাতে ধরে আছে শরবত। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাত মাথাটা ঘুরে গেল আমার।
বাবা মাকে এতবড় ধোকা দিচ্ছি !!! যে বাবা মা এত বিশ্বাস রাখেন আমার উপর। কখনো পয়সার হিসেব চাননি, কোথায় গেলাম, সেটা কোন দিন যাচাই করেননি। সেই বাবা মায়ের সাথে মিথ্যা বলে চলেছি। সেটাই ছিল আমার টার্নিং পয়েন্ট। প্রতিজ্ঞা করলাম। এরপর আর কখনো মিথ্যা বলিনি, এক পয়সা কারো আমানতের খেয়ানত করিনি। আমার কাছে চুল পরিমান বিশ্বাসের মূল্য এখন জীবনের চেয়েও বেশি। আলহামদুলিল্লাহ। জানি না কি কারণে আল্লাহপাক আমায় সেদিন হেদায়েত দান করেছিলেন।

বাবার বয়স ৮২+, একেবারেই শয্যাশায়ী। মায়ের শরীরও ভাল নয়। আজ পর্যন্ত তাঁরা আমার কাছে কখনো হিসেব নেননি। জানতে চাননি, আমি বেতন কত পাই। চাকুরিতে জয়েনিং এর আগে শুধু বলেছিলেন, খবরদার এক পয়সা হারাম নিয়ে কখনো ঘরে আসবে না।

হে আমাদের ভবিষ্যৎ সন্তানেরা, হতাশ হবার কিছু নেই। ফিরে এস সত্য আর বিশ্বাসের পথে। আমরা হয়ত পারিনি, আমরা আসহায়। আমাদের আগলে রাখ। বিশ্বাস ভঙ্গ কর না পিতা মাতার, স্বাধীনতার, লাল সবুজ পতাকার, এই মাটির। জীবন দিয়ে হলেও সত্যের মশাল ধরে রাখ।

খুব মনে পড়ে ছোটবেলার সেই দুরন্তপনা দিনগুলোর কথা। হারিয়ে যাওয়া সেই ঈদ আনন্দের কথা। মাঝে মাঝে হাসি পায় খুব। লজ্জাও পাই। কেন করেছিলাম সেই অস্বাভাবিক কাজগুলো।

লেখাটি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত।

লেখক: অতিরিক্ত সচিব, বাংলাদেশ সরকার।