ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড ও আমাদের ছয় তরুণ

ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড ও আমাদের ছয় তরুণ
ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী বাংলাদেশের ছয় তরুণ

প্রিন্স হ্যারি তার মা ডায়ানার নামে প্রবর্তন করেন ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড। পাঁচটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ২০২০ সালের এই অ্যাওয়ার্ডের জন্য বিশ্বের ১০০ তরুণকে মনোনীত করা হয়। এর মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশের। তালিকায় সবার আগে আছে শাহ রাফায়াত চৌধুরীর নাম। অন্য পাঁচজন হচ্ছেন- রাফিউল হক, শেখ ইনজামামুজ্জামান, জহিরুল ইসলাম, সাবিরা মেহজাবিন সাবা ও সাকিয়া। তারা স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভ্রমণের মতো বিষয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন।

রাফায়াতের ফুটস্পেস

২৪ বছর বয়সী শাহ রাফায়াত চৌধুরী পরিবেশ রক্ষা ও সামাজিক উদ্যোগের জন্য এই পুরস্কার পান। এছাড়াও তার গড়া সংগঠন ‘ফুটস্পেস’-এর মাধ্যমে তিনি সাধারণের উন্নয়নে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তার মাধ্যমে মোট ১৩টি সামাজিক উদ্যোগ ও প্রচারণা কার্যক্রম চলছে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক দায়িত্ব পালন তহবিলের সহায়তায় তার প্রতিষ্ঠান গরিব মানুষদের নিরাপদ পানি দেওয়ার কাজ করেছে। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৭৫ হাজার মানুষ নিরাপদ পানি পেয়েছে। রাফায়াত বলেন, ‘ফুটস্পেস একটি উন্নয়নভিত্তিক সামাজিক প্রতিষ্ঠান যা আমাদের বিদ্যমান বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার সমাধানের জন্য সামাজিক উদ্যোগের নকশা প্রণয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে আসছে। সামাজিক সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে যে কেউ তার সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে পারেন এমন দৃঢ় বিশ্বাসেই আমাদের পথচলা।’ রাফায়াত পরিবেশ অর্থনীতি ও নীতি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

ওয়ান্ডার উইমেন সাবিরা

ফেসবুকভিত্তিক নারী ভ্রমণকারীদের সংগঠন ওয়ান্ডার উইমেনের প্রতিষ্ঠাতা সাবিরা। এই সংগঠন কাজ করছে নারীদের ভ্রমণ নিয়ে। দেশ ও বিদেশে ভ্রমণ আয়োজন ছাড়াও বাংলাদেশি নারীদের ভ্রমণসহায়ক তথ্য প্রদান করার মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে এই সংগঠন। ভ্রমণের ক্ষেত্রে দেশ বা দেশের বাইরে নারীরা ভ্রমণ করতে গেলে দেখা দেয় নানা বিপত্তি। এক্ষেত্রে ইন্টারনেট থেকেও অনেক তথ্য সঠিকভাবে পাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না আবার দেখা যায়, অনেক স্থান নারীদের ভ্রমণ উপযোগী নয়। নতুন কোনো গন্তব্যে পৌঁছে নারীদের নির্বিঘ্নে ঘোরাঘুরির সুযোগ করে দেওয়ার কথা মাথায় নিয়েই ওয়ান্ডার উইমেনের পথচলা। প্রিন্সেস ডায়ানা অ্যাওয়ার্ডে তালিকাভুক্ত হওয়াটাকে অনেক বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন সাবিরা। নারীদের ভ্রমণ সহযোগিতায় কাজ করতে চান আগামীতেও। বদলাতে চান সামাজিক কুসংস্কারও। সাবিরা বলেন, ‘নিজের ওপর আস্থা এবং বিশ্বাস থাকলে যে কোনো কাজ করাই সম্ভব। আর আমাদের বাবা-মায়েরাও যদি মেয়ের কাজের প্রতি বিশ্বাস রাখেন তবেই বদলে যাবে অনেক কিছু।’

স্পন্সর আ চাইল্ড ও রাফিউল হক

সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনে কাজ করেন ২৩ বছর বয়সী রাফিউল হক। তার কাজের এই ইচ্ছে সেই এইটুকু বয়স থেকেই। রাফিউল জাগো ফাউন্ডেশনের হয়ে কাজ করেন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের লেখাপড়ার ডিজিটাল ফান্ডরাইজ এবং করোনা সংকট মোকাবিলায়। এছাড়া পানি দূষণ, পরিবেশবান্ধব পরিবহন এবং সমাজের বিভিন্ন সমস্যা বিষয়ক কার্যক্রমে রাফিউল নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে স্পন্সর আ চাইল্ড প্রজেক্ট। যেখানে মাত্র এক বছরের মধ্যে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াশোনার জন্য রাফিউল ১৫০ জন স্পন্সর পিতামাতার ব্যবস্থা করে বিশেষ অবদান রাখেন। পাশাপাশি তিনি শিশুদের পড়াশোনার জন্য প্রায় ৪০ হাজার ডলার অনুদান সংগ্রহ করেন। রাফিউল নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ মার্কেটিংয়ে পড়ছেন। ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড অর্জনের সব কৃতিত্ব দিতে চান জাগো ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা, তার মা-বাবা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের।

সাকিয়ার ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ

সাকিয়া হক পেশায় একজন ডাক্তার। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে ৩৯তম বিসিএস নিয়োগ পান। বর্তমানে মেডিকেল অফিসার ডিজিজ কনট্রোল হিসেবে কাজ করছেন কক্সবাজার সিভিল সার্জন অফিসে। সাকিয়া ডাক্তার বন্ধু মানসী সাহাকে নিয়ে গড়ে তোলেন ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ। ২০১৬ সালে শুরু করা এই ভ্রমণ সংগঠন দেশের প্রথম নারী সংগঠন যেখানে তারা মেয়েদের বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা সম্পর্কে অভিহিত করেন। অলাভজনক এই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে দেশের ৫১ হাজার মেয়ে যুক্ত আছেন। সংগঠনের মাধ্যমে ইতোমধ্যে আয়োজিত হয়েছে ৮৩টি ইভেন্ট। শুধু এটিই নয়, কাজ করেছেন সংগঠনের অধীনে ‘নারীর চোখে বাংলাদেশ’ নামে অন্য একটি প্রজেক্টেও। এর মাধ্যমে সাকিয়া ও মানসী ঘুরেছেন দেশের ৬৪ জেলা। প্রতিটি জেলায় একটি করে বিদ্যালয়ে কথা বলেছেন। শিখিয়েছেন সেল্কম্ফ ডিফেন্স। কথা বলেছেন স্বাস্থ্য ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। সাকিয়া বলেন, ‘এই যে আমরা এতগুলো মেয়ের কাছে যেতে পেরেছি, তাদের একটা ট্যাবু ভাঙাতে পেরেছি, এটাই আমার কাছে অর্জন।’

স্টাডি বাডির ইনজামাম

আহ্‌সানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসইতে স্নাতক করেছেন শেখ ইনজামামুজ্জামান। তার প্রতিষ্ঠান স্টাডি বাডি সম্পর্কে ইনজামামুজ্জামান বলেন, ‘আমরা সাধারণত লার্নিং ডিজঅ্যাবল বাচ্চাদের মনন ও মস্তিস্কের সঙ্গে সামঞ্জস্য উপযোগী কনটেক্সটচুয়ালাইজড টুলস ও রিসোর্স তৈরি করি। যেমন- অগমেন্টেড রিয়েলিটি বুকস, আইওটি হার্ডওয়্যার এবং গেমস। যার যথোপযুক্ত প্রয়োগ ও ব্যবহারে তাদের মস্তিস্কের ত্রুটিযুক্ত অংশে উদ্দীপনা সঞ্চারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাদের মস্তিস্ককে পূর্ণ কর্মক্ষম করে তুলে এবং তারা অপরাপর সুস্থ স্বাভাবিক বাচ্চাদের মতো স্বাচ্ছন্দ্য সাবলীলভাবে পড়াশোনায় অগ্রগতি অর্জনে সমর্থ হয়।’ এই পর্যন্ত ১৫০০-এরও বেশি মাতা-পিতা এবং ১০০০-এরও বেশি বাচ্চাদের সেবা প্রদান করে আসছে স্টাডি বাডি। যার ফলাফল এই বছর একই সঙ্গে জিতেছেন ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড এবং কমনওয়েলথ যুব পুরস্কার।

জহিরুলের ইগনাইট ইয়ুথ ফাউন্ডেশন

মুহাম্মদ জহিরুল ইসলামের গড়া প্রতিষ্ঠান ইগনাইট ইয়ুথ ফাউন্ডেশন। এই যুব সংগঠন কাজ করছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, বিনামূল্যে রক্তদান, পরিবেশ, যুব দারিদ্র্য নিরসন, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা সচেতনতায়। এছাড়া যুব ক্ষমতায়ন, উন্নয়ন, লিঙ্গ বৈষম্য এবং সামাজিক বৈষম্য নিয়ে ২৩ হাজার জাতীয় ও ২০০ আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবকের সঙ্গে ৮৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। জহিরুলের পড়াশোনা বাংলাদেশ কানাডা বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রিপল-ই বিভাগে। শুধু সংগঠন কিংবা সামাজিক কাজেই সীমাবদ্ধ নন তিনি। কাজ করছেন অনুপ্রেরণামূলক বক্তা হিসেবেও। ভূমিকা রাখছেন তরুণদের নানা অনুপ্রেরণামূলক কাজেও। মাত্র ২১ বছর বয়সী এই তরুণের অর্জনের ঝুলিটাও ভারী। জহিরুল কাজ করে যেতে চান শিশুশিক্ষা নিয়ে। কথা বলতে চান জনসাধারণের অধিকার নিয়ে।

প্রিয় পাঠক, এই তরুণদের হাত ধরে
লাল-সবুজের পতাকা উড়বে নতুন
উদ্যমে; এমন স্বপ্ন আমরা এখন
দেখতেই পারি।