ব্র্যান্ডিং টুকিটাকি

নাদিয়া মোমেন

মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার আরেক নাম ব্র্যান্ডিং। ব্র্যান্ডিংয়ের আক্ষরিক অর্থগুলো হচ্ছে দাগা, মশাল, কালিমা, তপ্ত লোহার ছ্যাঁকা, তরবার ।

ব্র্যন্ডিংয়ের আক্ষরিক অর্থগুলোয় ব্র্যান্ডিং নিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে। যেমন ধরুন আমি যদি নিজেকে মিথ্যাবাদী হিসেবে সবার সামনে উপস্থাপন করি সেটা আমার চরিত্রের উপর একটা দাগা কিংবা কালিমার ছাপরেখা নিয়ে আসবে। ব্যবসায়িক পরিভাষায় যাকে ডিব্র্যান্ডিং বলে।

আবার আমি যদি পণ করে বসি সদা সত্য কথা বলব, তাহলে সে পণ নিয়ে জীবনযাপন করা তপ্ত লোহার ছ্যাঁকার মতো হয়ে দাঁড়াবে। তবে এই সাধনা আমার মধ্যে বেশ কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসবে। ধীরে ধীরে আমার দোষগুণ আমি খুঁজে বের করে সেগুলোর পেছনেও সময় দিতে পারব। ধীরে ধীরে নিজেকে বিনয়ী, সত্যবাদী হিসেবে তুলে ধরতে পারব। এই যে আমার মনে নিজেকে পরিবর্তনের মশাল জ্বলে উঠেছে সে মশাল পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের আলো ছড়াচ্ছে।

সংকোচবোধ কাটিয়ে নিজেকে সবার সামনে তুলে ধরা শুরু করলে তা অন্যের উপর একটা প্রভাব তৈরি করে।

`নিজেকে জানা‘র এক মনস্তাত্তিক লড়াই থেকে বেরিয়ে অন্যের উপর নিজের প্রভাব তৈরি করা পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের নামান্তর। ধরুন, একটা সদ্য শুরু করা ব্যবসা। সে ব্যবসায় মানুষের উপর কেমন প্রভাব বিস্তার করবে তা ব্যবসায়ের মালিকের আচার-ব্যবহার, মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে পারা ইত্যাদির উপর নির্ভর করে।

নিজেকে সময়োপযোগী করে তোলা কিংবা আরো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো এসব ভাবনার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে বর্তমানে যান্ত্রিক প্রযুক্তিগুলো বেশ সহায়তা করছে। হাতের কাছে পাওয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে নিজেকে কিংবা প্রতিষ্ঠানকে ব্র্যান্ড করে তোলা হচ্ছে ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং।

আজ থেকে পাঁচ বছর আগেও কেউ চিন্তা করেনি টকশো, বিভিন্ন প্রোগ্রাম এসব অনলাইনে হবে। কিন্তু বর্তমানে সবকিছু অনলাইনে হচ্ছে। সংবাদপত্রও এখন প্রিন্ট আর অনলাইন এই দুটো সংস্করণে পাওয়া যায়।

ফেসবুক কিংবা ইন্সটাগ্রাম পেজ সাজিয়ে দেওয়া, পেজ বুস্ট করা এগুলোও এখন সময়ের প্রয়োজনে আলাদা ব্যবসায়ের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ের মার্কেটিং ক্ষেত্রের বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে ডিজিটাল মার্কেটিং।

তরুণরা দক্ষতা উন্নয়নের পেছনে ছুটছে। আবার প্রতিষ্ঠানও দক্ষ কর্মীর পেছনে লেগে আছে। যার ফলে চাকরির বাজারও এখন অনেক বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ। তবে ধার না দিলে তরবারি যেমন ভোঁতা হয়ে যায়, তেমনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সঠিক ব্যবহার করতে না পারলে কখনোই নিজেকে বা পণ্যকে বা প্রতিষ্ঠানকে ব্র্যান্ডে রুপ দেওয়া সম্ভব নয়। এ কাজ করতে বিনিয়োগ একটি মুঠোফোন, ইন্টারনেট এবং সৃজনশীল চিন্তাভাবনা।

একটা ফেসবুক কিংবা ইন্সটাগ্রাম পেজ খুলে বসে থাকলে হবে না । পেজে ইনভাইট দেওয়া, নিয়মিত আপডেট দেওয়া, কেউ কমেন্ট করলে দ্রুত সময়ের মধ্যে তাকে সাড়া দেওয়া, কেউ পেজে ম্যাসেজ করলে তাকে কম সময়ের মধ্যে উত্তর দেওয়া, এলগরিদম বুঝতে পারা, ফলোয়ার বাড়ার পর গ্রুপ তৈরি করা সব মিলিয়ে এটা একটু দীর্ঘ প্রক্রিয়া। শুরুতে বিরক্তিকর মনে হলেও একটা সময় পর নিয়মিত কাজগুলো করতে পারলে অনলাইন জগতে ভালো একটা ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি করে দেয়।

ডিজিটাল ব্র্যান্ডিংয়ে কন্টেন্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটা হতে পারে লেখা, ভিডিও, ছবি, পোস্টার, ব্লগ, ইত্যাদি। কন্টেন্ট হতে পারে তথ্যবহুল কিংবা বিনোদনে ভরপুর । এক্ষেত্রে মানুষের মনের রুচি বোঝাও জরুরি । তা না হলে এটা নিয়ে বেশি দূর আগানো যাবে না। কন্টেন্ট বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে নিয়মিত বিভিন্ন কমিউনিটিতেও দিতে হবে । কমিউনিটির মানুষদের সাথে পরিচিত হতে হবে। তাদের সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে। তাদের কাজকেও উৎসাহ দিতে হবে। এ কাজকে ব্যবসার পরিভাষায় কমিউনিটি ব্র্যান্ডিং বলে।

পরিশেষে বলা যায় নিজেকে কিংবা কোনও প্রতিষ্ঠানকে ব্র্যান্ড করে তুলতে কাজের প্রতি একাগ্রতা এবং লক্ষ্য অটুট থাকা জরুরি ।

লেখক:
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়