সাঁতারু মনির যেভাবে বাংলা চ্যানেল পাড়ি দিলেন

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলা চ্যানেল পাড়ি দিলেন সাঁতারু মনির
বাংলা চ্যানেল পাড়ি দিলেন সাঁতারু মনির। ছবি : সংগৃহীত

সম্প্রতি কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত ‘ফরচুন বাংলা চ্যানেল সুইমিং ২০২০’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের সরকারি সা’দত কলেজের স্নাতকোত্তর হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মনির হোসেন। শাহপরীর দ্বীপ থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত ১৬.১ কিলোমিটার জলপথ পাড়ি দেওয়ার গল্প তুলে ধরা হলো—

চৈত্রের রোদে ক্ষেতের পর ক্ষেত দৌড়ে বেড়ানো দুরন্ত স্বভাবের ছেলেটির খেলাধুলার সাথে বেড়ে ওঠা। নিজ গ্রাম সখীপুরের ইন্দারজানি ভাতগড়ায় নদী বা পুকুর না থাকলেও নানা বাড়ি কালিহাতি গিয়ে নদীর পানিতে মামাতো ভাইদের সাথে ঠিকই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেছে। এজন্য পরিবারের গালমন্দও কম জোটেনি। কিন্তু কে শোনে কার কথা? এভাবেই বেড়া ওঠেন সাঁতারু বা দৌড়বিদ মনির হোসেন।

২০১৮ সালে বাংলা চ্যানেল সুইমিং নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে তার মনে ‘বাংলা চ্যানেল’ সম্পর্কে আগ্রহ জাগে। এরপর থেকেই সাঁতরে এ জলপথ পাড়ি দেওয়ার ইচ্ছা জাগে মনির হোসেনের। ছোটবেলার সেই দুরন্ত ছেলেটির দুরন্তপনা যেন আরও বাড়ে। কলেজের বড় পুকুরে গিয়ে সময়ে-অসময়ে সাঁতার কাটতেন। এভাবেই এক বছর নিজেকে প্রস্তুত করে নেন।

রংপুরের চিকলি বিলে বাছাইপর্বে ফাইনালে জায়গা করে নেন। এরপর ২০১৯ সালের বাংলা চ্যানেল সুইমিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। সাঁতার চলছে তো চলছে। হঠাৎ থেমে গেলেন মনির। উরুতে ব্যথা পেয়ে সেবার আর স্বপ্নপূরণ হয়নি। মন খারাপ করে কক্সবাজার থেকে বাড়ি ফেরেন।

হেরে যাওয়া মানে থেমে যাওয়া নয়। আবারও বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার স্বপ্নে ডুবে গেলেন মনির। আগের থেকে আরও বেশি সময় নিয়ে পুকুরে সাঁতরে নিজেকে প্রস্তুত করে নিলেন। ঢাকায় জহুরুল হক হলের পুকুরে বাছাই পর্বে সুযোগ পেলেন।

করোনার জন্য দেরিতে হলেও শেষপর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় ‘ফরচুন বাংলা চ্যানেল সুইমিং’ প্রতিযোগিতা। এবার ৪৩ জন অংশগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে ৪০ জন পাড়ি দেন বাংলা চ্যানেল। তাদের একজন হতে পেরে খুশি মনির হোসেন। তার দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণে পরিবার, বন্ধু ও এলাকাবাসী আনন্দিত।

এ ছাড়াও তিনি নিয়মিত দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। এ বছরের জানুয়ারিতে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত মেরিন ড্রাইভ আল্ট্রা ম্যারাথনে ইনানী থেকে শুরু করে টেকনাফ পর্যন্ত ১৬১ কিলোমিটার দৌড়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন।

সাঁতারু মনির হোসেন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই স্কুল-কলেজের খেলাধুলায় সব সময় অংশগ্রহণ করি। লং জাম্প, হাই জাম্প, দৌড়ে আমি ছিলাম সবার আগে। সাঁতার নিয়ে তেমন না ভাবলেও ২০১৮ সালে আমার ইচ্ছা হয় বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার। এর জন্য কলেজ হোস্টেলে থেকে পড়াশোনার ফাঁকে যতটুকু সময় পেয়েছি, আশেপাশের বড় পুকুরে গিয়ে সাঁতার কেটেছি।’

তিনি বলেন, ‘কখনো বড় ভাই অথবা ছোট ভাইদের জোর করে পুকুরে নিয়ে যেতাম। তাদের বাদাম কিনে দিতাম। তারা পাড়ে বসে থাকত আর আমি সাঁতার কাটতাম। শীত বা গরম আমার কাছে সমান ছিল। আমার একটাই লক্ষ্য ছিল- বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেব।’

মনির বলেন, ‘২০১৯ সালে টাকার জন্য রংপুরে বাছাই পর্বে যেতে পারছিলাম না। আমার এক বন্ধু ১০ হাজার টাকা ধার দেন। তারপর সেটা নিয়ে চলে যাই। সেবার বাংলা চ্যানেল সুইমিং করতে গিয়ে উরুতে ব্যথা পাই। স্বপ্নের কাছাকাছি গিয়েও স্বপ্নপূরণ হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রচুর মন খারাপ ছিল। এরপর আরও বেশি সাঁতার কেটে নিজেকে প্রস্তুত করে নিলাম। এবার টাকার সমস্যা ছিল। সেই বন্ধুই আমাকে সাহায্য করলেন। চলে গেলাম কক্সবাজার। ৪৩ জন অংশ নিলাম। দু’জন নারী ও একজন বিদেশিও ছিলেন। আমি পাঁচ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটে বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেই। আমার স্বপ্ন পূরণ হলো।’

আগামী বছর মালয়েশিয়ায় আয়রনম্যান প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন দৌড়বিদ ও সাঁতারু মনির হোসেন।