স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে রিমি

স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে রিমি
রিমি খোন্দকার জানালেন উদ্যোক্তা হয়ে উঠার গল্প

উদ্যোক্তা জীবনের শুরু
অনেক দিন থেকেই পড়াশুনা করছিলাম ইকমার্স নিয়ে। তারপর সিদ্ধান্ত নিই দেশীয় বিভিন্ন শাড়ি নিয়ে কাজ করব, কারন আমি নিজে শাড়ি পরতে ভালবাসি। এরই মধ্যে শুরু হলো করোনা আর লকডাউন, পুরো প্ল্যান ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম। অন্যদিকে নিজের এবং পরিবারের আশেপাশের সবার অর্থনৈতিক অবস্থা শোচনীয়। কাউকে সহযোগিতা করার সামর্থ নেই, ভীষণ খারাপ লাগতে শুরু করল। ভাবতে শুরু করলাম কী করা যায়।

যেহেতু অনেক দিন ধরে ই-কমার্স নিয়ে পড়াশুনা করছিলাম, তাই কিছু এলাকার তাঁতীর সাথে আগেই যোগাযোগ হয়েছিল। হাতে ছিল ২০ হাজার টাকা পুঁজি। ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে এই ২০ হাজার টাকার পুরোটা দিয়েই শাড়ি কিনে ফেলি। করোনায় বসে অর্থনৈতিক ভাবে, মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। তাই অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা, মানসিক প্রশান্তির জন্য একটা উদ্যোগ নেয়া খুব জরুরি ছিল। আমি শুধু নিজে ব্যবসা করতে চাইনি,চেয়েছি ব্যবসার লভ্যাংশ দিয়ে আমার আশেপাশের সবার উপকার করতে। এখানে মানবিকতার ব্যাপারও জড়িত ছিল।

সাধারণ ছুটির মাঝেই ঘরে বসে তৈরি করি ফেসবুক পেজ গোলাপজানের। দিনটি ছিলো ১ মে ২০২০। বলতে পারেন এইদিনই গোলাপজানের প্রতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। আর আমার উদ্যোক্তা জীবন। শুরুতে ভেবেছিলাম গোলাপজানে শুধু শাড়ি রাখব। এরই মধ্যে খবর পেলাম পাবনার এক তাঁতীর আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। লকডাউনের কারণে, তার ঘরে খাবার নেই, কিন্তু লুঙ্গী আছে।আমি ভাবলাম তার থেকে কিছু লুঙ্গী কিনে নিই তাহলে তার উপকার হবে। আশ্চর্যের বিষয় লুঙ্গীগুলো আনার একদিনের মাথায় সব সেল হয়ে গেছে।

কেন গোলাপজান
অনেকেই জিজ্ঞেস করে এই নামটা কেন দিলাম! আসলে আমার মাথায় শুধু পেইজ খুলব আর সেল করব এমন ব্যাপার ছিল না। আমি চেয়েছি পুরোনো ধাঁচের একটা ইউনিক নাম, অবশ্যই বাংলা হতে হবে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমাদের দাদি-নানিদের নামগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। তাই গোলাপজান নামটা বেছে নিয়েছি। আমাদের দাদি-নানিদের নামকে স্মরণ করার জন্য। আর দাদি-নানিরা সবসময় শাড়িতে স্বচ্ছন্দ। পেইজে যেহেতু শাড়ি বিক্রি প্রধান্য পাবে, সেই ভাবনা থেকেই গোলাপজান।
আমাদের স্লোগান- পোশাকে ফুটে উঠুক আপনার ব্যক্তিত্ব।

স্বপ্ন
স্বপ্ন আকাশছোঁয়া। আমি চাই গোলাপজান দেশের সবার কাছে পরিচিত হোক। সবাই গোলাপজানকে চিনুক-জানুক। গোলাপজান বিপন্ন মানুষের সহায়তায় সবসময় পাশে দাঁড়াবে। অসহায়কে সাহায্য করবে। বিজনেসের থেকে মানবিকতা বড় হোক।

ফেনীতে পরিচিতি
খুবই খুশির খবর ফেনীর উদ্যোক্তাদের মাঝে ফেনীর ফেসবুক কমিউনিটির মাঝে নিজেকে পরিচিত করে তুলতে পেরেছি অল্প সময়ে। সত্যি কথা বলতে ঢাকাতে বসে কাজ করলেও আমার সবচাইতে বেশি বিক্রি হয় কিন্তু ফেনীতে। এলাকার পরিচিতি হয়তো এখানে কাজ করেছে। আর অনলাইনে বিস্বস্তার বিষয়টিও প্রধাণ্য পায়। ফেনীর আপুদের ভালবাসায় আমি মুগ্ধ। আমি নিজেকে ফেনীর মেয়ে, ফেনীর উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি।আমি চাই নিজের মাধ্যমে, গোলাপজানের মাধ্যমে প্রাণের জেলা ফেনীকেও তুলে ধরতে। চাই সবাই আমার নামের আগে বলুক ফেনীর রিমি।

কেন উদ্যোক্তা হলাম
দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে পড়াশুনা শেষ করে গতানুগতিক ধারার চাকরিতে না গিয়ে কেন উদ্যোক্তা হলাম, অনেকেই এই প্রশ্ন করেন। আসলে আমি চেয়েছি স্বাধীনভাবে নিজে কিছু করতে সবসময়। ধরাবাঁধা, যেখানে নিজে কিছু করার সুযোগ নেই, এমন কিছু করতে চাইনি। এজন্যই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছি।

পুঁজি
২০ হাজার টাকা পুঁজি দিয়ে শুরু করে ২ মাসে আমার সেল প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা। পরে আরো কিছু টাকা এড করেছি পুঁজির জন্য। এরমধ্যে ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা সেল হয়েছে উই গ্রুপে। আমি একটা প্রোডাক্ট বিক্রি করে সেই টাকা আবার পুনরায় বিনিয়োগ করেছি। এভাবে বিনিয়োগ বাড়িয়েছি।

পারিবারিক সাপোর্ট
বিজনেস শুরু করার পর সবার সাহায্য পেয়েছি, সবাই সাপোর্ট করেছে। আমার বর মাইনুল আমাকে অনেক বেশি সাপোর্ট করেছে। এজন্য তার নিকট অনেক কৃতজ্ঞতা। আমার ভাইবোনেরা পুঁজি দিয়ে, শুশুর বাড়ির থেকেও সাপোর্ট পেয়েছি প্রোডাক্ট কিনে আমাকে উৎসাহ দিয়েছে।

ভবিষ্যৎ ভাবনা
ব্যবসার প্রধান উদ্দেশ্য বিক্রি এবং সেল হলেও আমি এই ধারার বাইরে যেতে চাই। আমি চাই এটা এক ধরনের সেবাও হোক। প্রায়ই কেউ বলে মায়ের জন্য শাড়ি নেবো, বাবার জন্য লুঙ্গী নেবো কিন্তু তার বাজেটে হচ্ছে না। তখন আমি ভালবাসার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অনেক কমে (সামর্থ্য থাকলে ফ্রি দিতাম) পণ্য বিক্রি করি। আমাদের দেশের ফ্যাশন জগতটা ঢাকা কেন্দ্রিক। ঢাকার মানুষেরা নিত্য নতুন পোশাক সবার আগে পায়। আমি চেয়েছি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছেও যেন আপডেট পণ্য পৌঁছাতে পারি। তাছাড়া আমার আরেকটা উদ্দেশ্য বাজেট ফ্রেন্ডলি পোশাক। যাতে করে সবার হাতের নাগালের মধ্যে থাকে আমার পণ্য।

দুঃসময়-করোনা জয়
উদ্যোগ শুরু করার দুই মাসের মাথায় জুনের ২২ তারিখ করোনা আক্রান্ত হলাম। নতুন উদ্যোগ তাই কাজের ধারাবাহিকতা থাকাও জরুরি। করোনা নিয়েও কাজ করেছি,পেইজে অর্ডার নিয়েছি, গ্রাহকদের থেকে সময় নিয়েছি প্রোডাক্ট ডেলিভারি দেয়ার জন্য ।

উইতে (Women and e-commerce forum-WE) লাখপতি হওয়ার গল্প
উইতে লাখ পতি অর্থাৎ লাখ টাকার সেল হয় ৮ জুলাই। রোজা থেকেই টুকটাক বিক্রি শুরু হয়। আস্তে আস্তে সেই অল্প অল্প বিক্রি লাখে এসে পৌঁছাতে সময় লাগে জুলাইয়ের ৮ তারিখ অব্দি। এজন্য আমি রাজিব ভাইয়া ও নিশা আপুর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। উইর মতো দেশীয় পণ্যের প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার জন্য। আমি কাজ করেছি সম্পূর্ণ দেশীয় পণ্য শাড়ি-লুঙ্গি- থ্রিপিস নিয়ে। বলতে পারেন উইয়ের রাজীব ভাইয়া এবং নিশা আপু আমার অনুপ্রেরণা। উনাদের দেখে উদ্যোক্তা হতে অনেক সাহস পেয়েছি। নয়তো এতদূর আসতে পারতাম না।