শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২২
Homeঅন্যান্যবাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের উন্নতি ও দশ নম্বর বিপদ সংকেত

বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের উন্নতি ও দশ নম্বর বিপদ সংকেত

মোহাম্মদ আমান উল্লাহ আমান


সেদিন যুক্তরাজ্যে বসবাসরত একজন বাংলাদেশি বিজ্ঞ চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টের সঙ্গে কথা হলো। মো. শাহাবুদ্দীন ভাই। চাঁদপুরের সন্তান। অনেক ভালো লেগেছে কথা বলে। অমায়িক ব্যক্তিত্ব। একদম মন খোলা সাদা মনের মানুষ। স্বদেশিরা যেখানে দেশের টাকা লুটপাট করে বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ে, সেখানে তিনি দেশের মানুষের জন্য অধিক পরিমাণে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স পাঠানোর চিন্তা করেন। 

তিনি এন্টারপ্রাইজ ৩৬০ লিমিটেডের টেকসই ব্যবসায় উন্নয়নের প্রচেষ্টার কথা শুনে প্রশংসা করেছেন। কথায় কথায় চলে আসে আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পের কথা। সেই সঙ্গে আমাদের অন্ধকার ভবিষ্যতের কথাও। তিনি ব্যাখ্যা করলেন কেন উন্নত বিশ্বের দেশগুলো তাদের পোশাক নিজের দেশে তৈরি না করে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো থেকে আমদানি করে। আমরা যেই সস্তা শ্রমের সুবিধার কারণটিকে আমাদের দেশে এই শিল্পের বিকাশের মুখ্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করি সেটি আসলে মুখ্য কারণ নয়; বরং গৌণ কারণ। মুখ্য কারণ অন্য একটি। অত্যন্ত চমৎকারভাবে তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করলেন। আমার বোধগম্য হলো এবং জাতির ভবিষ্যত অন্ধকার দেখে ভীত হলাম। মনে হলো নীতি-নির্ধারণী পর্যায়সহ সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এই বিষয় নিয়ে বেশি বেশি লেখা-লেখি এবং আলোচনা চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। তাতে হয়তো আমাদের ঝুঁকি কমানোর নিমিত্তে যথাযথ উদ্যোগ আসতে পারে।

পোশাক শিল্পের বিকাশের নিয়ামক হিসেবে আমরা আমাদের সস্তা শ্রমের কথা বলি। যার কারণে প্রতিযোগীদের তুলনায় কম খরচে বিশ্ববাজারে পোশাক সরবরাহ করতে পারি বিধায় উন্নত বিশ্বের দেশগুলো আমাদের কাছ থেকে পোশাক ক্রয় করে থাকে। যদি উৎপাদন খরচই মুখ্য কারণ হয়, তবে রোবট ব্যবহার করে খরচ কমানো যায়। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে রোবটিক প্রসেস অটোমেশন ও থ্রিডি প্রিন্টার্স নিয়ে কাজ হচ্ছে উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরো কস্ট ইফেক্টিভ করার জন্য। ইউরোপ-আমেরিকায় ভারী অথবা হালকা যেকোনো ধরনের শিল্প-কারখানাতেই আজকাল রোবটের ব্যবহার পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাতে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে। সেই সাথে খরচও কমেছে। সুতরাং পোশাক শিল্পের কারখানাতেও আর.পি.এ-এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে খরচ কমানো সম্ভব।

প্রশ্ন হলো, তাহলে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো কেন পোশাক শিল্প কারখানা গড়ে তুলছে না। কেন তারা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো থেকে পোশাক আমদানি করে অথবা এখানকার পোশাক কারখানায় বিনিয়োগ করে। শাহাবুদ্দীন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার পর কারণটি বোঝা গেল।

পোশাক শিল্পে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়। সেই রাসায়নিক প্রয়োগ এবং পরিষ্কার করার জন্য প্রচুর পরিমাণে পানি খরচ করতে হয়। বিশেষ করে ডায়িং এবং ওয়াশিং ইউনিটে পানির ব্যবহার অধিক। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এক কেজি ফেব্রিক উৎপাদনে গড়ে খরচ হয় ২৫০-৩০০ লিটার মিঠা পানি। ব্যবহারের পর সেই পানি আর সুপেয় থাকে না। হয়ে যায় দূষিত। সেই দূষিত পানি আবার নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুড় ও ডোবার পানিকে দূষিত করে। অথচ সব দেশেই মিঠা পানির অপর্যাপ্ততা রয়েছে। আর তা যদি দূষিত হয়ে যায় বা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যায় তাহলে অবস্থা কোথায় গিয়ে দাড়াবে? উন্নত দেশের নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি অনুধাবন করতে পারে। তারা চাইলে রোবট ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ কমাতে পারবে। কিন্তু পানির খরচ কমাবে কিভাবে? পানি তো খরচ করতেই হবে পোশাক শিল্পের জন্য।

বলা হয় যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে পানি নিয়ে। তার কারণ- শিল্প কারখানায় অতিরিক্ত পরিমাণে পানি ব্যবহার ও পানি দূষণের ফলে পৃথিবীতে সুপেয় পানির পরিমাণ অবিশ্বাস্য রকম পরিমাণে কমে যাবে। উন্নত রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকগণ এই বিষয়ে সতর্ক। এমন কি তৈরি পোশাকের বাজারে নেতৃত্বদানকারী চীনও তার দেশ থেকে পোশাক কারখানাগুলো সরিয়ে অন্যত্র স্থাপন করছে। কিন্তু আমরা সতর্ক নই। পোশাক শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশে ব্যাপকভাবে কাজ করছি। কিন্তু পানির ব্যবহার এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে কি আমাদের যথাযথ ব্যবস্থা আছে? বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণেও কি আমাদের কোনো ব্যবস্থা আছে? এই দেশে কী আছে আর কী নেই, আমাদের সবারই কম-বেশি জানা। এই কারণেই আমার ভয়-শঙ্কা বেশি। পোশাক শিল্পের মালিকদের তো অনেকেরই বিদেশে বাড়ি আছে। দুঃসময়ে সেখানে আশ্রয় নেবে। আমাদের তো নেই। আমরা কোথায় যাব?

শাহাবুদ্দীন ভাই আরেকটি কথা সুন্দর বলেছে। আমরা মেডিক্যাল কলেজ আর হাসপাতাল বাড়াচ্ছি প্রতি বছর অসুস্থ মানুষের সেবা দেওয়ার জন্য। কিন্তু মানুষকে সুস্থ রাখার কোনো উদ্যোগ আমাদের নেই।

লেখক: উদ্যোক্তা অর্থনীতিবিদ ও টেকসই ব্যবসায় উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ;
চেয়ারম্যান, এন্টারপ্রাইজ ৩৬০ লি. ও স্কুল অব অন্ট্রাপ্রেনারশিপ ডেভেলপম্যান্ট

সর্বাধিক প্রচারিত